ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা আর দারুণ ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট ফোনের সহজলভ্যতার কল্যাণে এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ বেশ সহজ হয়ে গিয়েছে। এমনকি নিজের ক্যামেরা না থাকলেও বন্ধুমহলে কারো ক্যামেরা থাকলেই চলচ্চিত্র নির্মাণের দারুণ একটা চল দেখা যায় ইদানিং, যা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেও আসছে খুব দারুণ দারুণ কাজ। এছাড়া, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পাড়ার যে করুণ চিত্র আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, তাও ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে তরুণ নির্মাতাদের কল্যাণে। প্রতি বছরই অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র আসছে যা একই সাথে সমালোচকদের প্রশংসা পাচ্ছে এবং সাধারণ দর্শকদেরও মন জয় করছে। অশ্লীল চলচ্চিত্রের এক ভয়াবহ কালো অধ্যায় থেকে বেশ বাইরে চলে এসেছে ঢালিউড। সব মিলিয়ে একটা সুসময়ের শুরু হয়েছে- এটা বলা বোধহয় নিরাপদ!
কিন্তু সবসময় কোনকিছুর পরিমাণ দিয়ে তার মান যাচাই করা সম্ভব হয় না। ইউটিউব এবং ভিমিওতে বাংলা চলচ্চিত্র, বিশেষত বাংলা ক্ষুদে চলচ্চিত্র এখন বেশ উন্নতি লাভ করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর সাথে বেশ অনেক কাজ আসছে যা দেখে মনে হয়, ক্যামেরা একটু বেশিই বোধহয় সহজলভ্য হয়ে গেছে হয়তো!
চলচ্চিত্র নিয়ে প্রথম যে কোর্সটি করি “পাঠশালা” এর সিনেমা ডিপার্টমেন্টে, সেখানে ইশতিয়াক জিকো ভাইয়া আমাদের ক্লাস নিয়েছিলেন। প্রথমদিন উনি বেশ ক’টি ক্ষুদে চলচ্চিত্র দেখান। আনকোড়া আমরা কয়েকটির মাজেজা খুব একটা বুঝি নি, আবার কিছু বুঝেছিলাম। উনি দিনশেষে একটা কথা বলেছিলেন, চলচ্চিত্র বানানোর আগে চলচ্চিত্র পড়তে জানতে হবে। অবাক হয়েছিলাম এ ভেবে, চলচ্চিত্র তো দেখা বা বোঝার জিনিস, এটা কোনভাবেই পড়ার জিনিস না। এমনও না যে চলচ্চিত্র সম্পর্কিত বই পড়তে বলছেন, বলছেন- চলচ্চিত্র পড়তে হবে!
কোর্স শেষে বুঝেছিলাম, এই পড়তে পারার ক্ষমতাটা শুরু হয় চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ শেখার মাধ্যমে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি শিশু কীভাবে কথা শিখে সেটা ভাবা যায়। পরিবারের আশেপাশে থাকতে থাকতে সে সবার কথা শুনে, তারপর একটি দুটি শব্দ শিখে, তারপর বাক্য বলা শিখে। ধীরে ধীরে সমাজ তাকে গঠন করে, সে কথা বলতে শিখে। কিন্তু লিখতে শেখাটা কি একই ভাবে হয়? উত্তর হচ্ছে, “না”।
লিখতে শেখার প্রথম ধাপ অক্ষর শেখা, তারপর অক্ষরগুলো ঠিক কীভাবে বসালে তা একটা অর্থবহ শব্দ হবে তা শেখানো হয়। শব্দগুলো ঠিক কীভাবে সাজালে একটা অর্থবহ বাক্য হবে এটা হচ্ছে পরের ধাপ। বাক্যগুলো ঠিক কীভাবে পরপর সাজালে, ঠিক কোন যতিচিহ্ন দিলে তা একটা অর্থবহ প্যারাগ্রাফ হবে – এই জিনিসগুলো আমরা শিখি ব্যাকরণের মাধ্যমে। এখানে লক্ষণীয়, ভাষা শিখছি আমরা শুধু শুনে শুনে বা দেখে দেখে, কিন্তু নিজে কিছু লেখার জন্যে ব্যাকরণের সাহায্যটা লাগে।
চলচ্চিত্রও এক্ষেত্রে অনেকটা ভাষার মতন। ছোটবেলা থেকেই আমরা অনেক অনেক চলচ্চিত্র দেখি। একসময় মনে হয় আমরাও একটি বানিয়ে ফেলি, কলম(ক্যামেরা) তো আছেই। কিন্তু যেখানে পিছিয়ে যাই, তা হলো ব্যাকরণ। চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ এবং ভাষার ব্যাকরণ অনেকটা একরকম। একটা ফ্রেমকে একটা অক্ষরের সাথে তুলনা করা যায়। অনেকধরণের ফ্রেম আছে- ক্লোজ, ওয়াইড ইত্যাদি। এরকম অনেকগুলো ফ্রেম মিলে হয় একটা শট, যেমন একটা শব্দ! কয়েকটি অক্ষর পাশাপাশি বসালেই যেমন শব্দ হয়ে যায় না, তেমনি কয়েকটি ফ্রেম একসাথে বসালেই শট হয় না। অনেকগুলো শট একসাথে বসালে হয় একটা দৃশ্য(Scene), যাকে তুলনা করা যায় বাক্যের সাথে। বাক্যগুলোকে যতিচিহ্ন দিয়ে পাশাপাশি বসিয়ে এমন একটা প্যারাগ্রাফ পাওয়া যায়, তেমনি দৃশ্যগুলোকে পাশাপাশি বসিয়ে মাঝে কিছু ট্রাঞ্জিশন দিয়ে বা না দিয়ে(একান্তই পরিচালকের ইচ্ছা) আমরা পাই দৃশ্যমালা(Sequence)! আর অনেকগুলো দৃশ্যমালা নিয়েই তৈরী হয় একটা চলচ্চিত্র, যেন একটা পুরোদস্তর বই!
হ্যাঁ, বই যেমন পড়া যায় প্রত্যেকটা শব্দ, বাক্য, প্যারাগ্রাফকে দেখে, তেমনি একটা চলচ্চিত্রও পড়া যায়, প্রত্যেকটা শট, প্রত্যেকটা দৃশ্য, প্রত্যেকটা দৃশ্যমালাকে অনুধাবন করে। এখানে মৌলিক অনেক নিয়ম আছে যা চলচ্চিত্রকে প্রাণ দেয়, তাকে শুধু একটা দ্বিমাত্রিক তলে না রেখে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তোলে।
চলচ্চিত্র ব্যাকরণের এই কথাগুলো জানার পরে কোন একটা চলচ্চিত্র দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গিয়েছিল। চলচ্চিত্রের গল্প যেমন একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে টানতো, তেমনি চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি শট-দৃশ্য আলাদাভাবে দেখা শুরু করলাম। ঠিক তখন থেকে মনে হওয়া শুরু হলো, আমরা এখনো কতটা পিছিয়ে এই চলচ্চিত্রের দুনিয়ায়। কিন্তু এর অর্থ এ নয়, আমরা কিছুই পারছি না বা করছি না, এখানে অনুধাবন করার বিষয়, আমাদের চলচ্চিত্র ব্যাপারে শিক্ষার বেশ ঘাটতি আছে, যা আমাদের পূরণ করতে হবে এর ব্যাকরণটাকে ধারণ করার মাধ্যমে।
এই কথাগুলোর সবচেয়ে বড় পালটা প্রশ্ন হচ্ছে, অনেক বড় বড় নির্মাতারাই ব্যাকরণের ধার ধারেন না। তারা নিজের মনের ইচ্ছেমতন শট-দৃশ্য বাছাই করেন। তাহলে আমাদের কেন এত নিয়ম মানতে হবে?
এর উত্তর খুব সহজে একটা লাইনে বলা যায়, “Making Cinema is like playing a piano. First you must learn to play by the rules, then you must forget the rules and play from your heart”
হ্যাঁ, এভাবেই কালজয়ী সব কাব্য-গল্প-গ্রন্থ আর চলচ্চিত্র রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। আশা করা যায়, আমাদের দেশ থেকেও এরকম অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ নির্মাতা আসবে যারা নিজের পুরোটা দিয়ে চলচ্চিত্র বানাবে, যা বিশ্বব্যাপী হবে সমাদৃত।
মুদ্দা কথা, চলচ্চিত্র নির্মাণ অব্যাহত থাকুক, কিন্তু একই সাথে চলচ্চিত্র পড়া এবং শেখাটাও চলুক।
কিন্তু সবসময় কোনকিছুর পরিমাণ দিয়ে তার মান যাচাই করা সম্ভব হয় না। ইউটিউব এবং ভিমিওতে বাংলা চলচ্চিত্র, বিশেষত বাংলা ক্ষুদে চলচ্চিত্র এখন বেশ উন্নতি লাভ করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর সাথে বেশ অনেক কাজ আসছে যা দেখে মনে হয়, ক্যামেরা একটু বেশিই বোধহয় সহজলভ্য হয়ে গেছে হয়তো!
চলচ্চিত্র নিয়ে প্রথম যে কোর্সটি করি “পাঠশালা” এর সিনেমা ডিপার্টমেন্টে, সেখানে ইশতিয়াক জিকো ভাইয়া আমাদের ক্লাস নিয়েছিলেন। প্রথমদিন উনি বেশ ক’টি ক্ষুদে চলচ্চিত্র দেখান। আনকোড়া আমরা কয়েকটির মাজেজা খুব একটা বুঝি নি, আবার কিছু বুঝেছিলাম। উনি দিনশেষে একটা কথা বলেছিলেন, চলচ্চিত্র বানানোর আগে চলচ্চিত্র পড়তে জানতে হবে। অবাক হয়েছিলাম এ ভেবে, চলচ্চিত্র তো দেখা বা বোঝার জিনিস, এটা কোনভাবেই পড়ার জিনিস না। এমনও না যে চলচ্চিত্র সম্পর্কিত বই পড়তে বলছেন, বলছেন- চলচ্চিত্র পড়তে হবে!
কোর্স শেষে বুঝেছিলাম, এই পড়তে পারার ক্ষমতাটা শুরু হয় চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ শেখার মাধ্যমে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি শিশু কীভাবে কথা শিখে সেটা ভাবা যায়। পরিবারের আশেপাশে থাকতে থাকতে সে সবার কথা শুনে, তারপর একটি দুটি শব্দ শিখে, তারপর বাক্য বলা শিখে। ধীরে ধীরে সমাজ তাকে গঠন করে, সে কথা বলতে শিখে। কিন্তু লিখতে শেখাটা কি একই ভাবে হয়? উত্তর হচ্ছে, “না”।
লিখতে শেখার প্রথম ধাপ অক্ষর শেখা, তারপর অক্ষরগুলো ঠিক কীভাবে বসালে তা একটা অর্থবহ শব্দ হবে তা শেখানো হয়। শব্দগুলো ঠিক কীভাবে সাজালে একটা অর্থবহ বাক্য হবে এটা হচ্ছে পরের ধাপ। বাক্যগুলো ঠিক কীভাবে পরপর সাজালে, ঠিক কোন যতিচিহ্ন দিলে তা একটা অর্থবহ প্যারাগ্রাফ হবে – এই জিনিসগুলো আমরা শিখি ব্যাকরণের মাধ্যমে। এখানে লক্ষণীয়, ভাষা শিখছি আমরা শুধু শুনে শুনে বা দেখে দেখে, কিন্তু নিজে কিছু লেখার জন্যে ব্যাকরণের সাহায্যটা লাগে।
চলচ্চিত্রও এক্ষেত্রে অনেকটা ভাষার মতন। ছোটবেলা থেকেই আমরা অনেক অনেক চলচ্চিত্র দেখি। একসময় মনে হয় আমরাও একটি বানিয়ে ফেলি, কলম(ক্যামেরা) তো আছেই। কিন্তু যেখানে পিছিয়ে যাই, তা হলো ব্যাকরণ। চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ এবং ভাষার ব্যাকরণ অনেকটা একরকম। একটা ফ্রেমকে একটা অক্ষরের সাথে তুলনা করা যায়। অনেকধরণের ফ্রেম আছে- ক্লোজ, ওয়াইড ইত্যাদি। এরকম অনেকগুলো ফ্রেম মিলে হয় একটা শট, যেমন একটা শব্দ! কয়েকটি অক্ষর পাশাপাশি বসালেই যেমন শব্দ হয়ে যায় না, তেমনি কয়েকটি ফ্রেম একসাথে বসালেই শট হয় না। অনেকগুলো শট একসাথে বসালে হয় একটা দৃশ্য(Scene), যাকে তুলনা করা যায় বাক্যের সাথে। বাক্যগুলোকে যতিচিহ্ন দিয়ে পাশাপাশি বসিয়ে এমন একটা প্যারাগ্রাফ পাওয়া যায়, তেমনি দৃশ্যগুলোকে পাশাপাশি বসিয়ে মাঝে কিছু ট্রাঞ্জিশন দিয়ে বা না দিয়ে(একান্তই পরিচালকের ইচ্ছা) আমরা পাই দৃশ্যমালা(Sequence)! আর অনেকগুলো দৃশ্যমালা নিয়েই তৈরী হয় একটা চলচ্চিত্র, যেন একটা পুরোদস্তর বই!
হ্যাঁ, বই যেমন পড়া যায় প্রত্যেকটা শব্দ, বাক্য, প্যারাগ্রাফকে দেখে, তেমনি একটা চলচ্চিত্রও পড়া যায়, প্রত্যেকটা শট, প্রত্যেকটা দৃশ্য, প্রত্যেকটা দৃশ্যমালাকে অনুধাবন করে। এখানে মৌলিক অনেক নিয়ম আছে যা চলচ্চিত্রকে প্রাণ দেয়, তাকে শুধু একটা দ্বিমাত্রিক তলে না রেখে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তোলে।
চলচ্চিত্র ব্যাকরণের এই কথাগুলো জানার পরে কোন একটা চলচ্চিত্র দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গিয়েছিল। চলচ্চিত্রের গল্প যেমন একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে টানতো, তেমনি চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি শট-দৃশ্য আলাদাভাবে দেখা শুরু করলাম। ঠিক তখন থেকে মনে হওয়া শুরু হলো, আমরা এখনো কতটা পিছিয়ে এই চলচ্চিত্রের দুনিয়ায়। কিন্তু এর অর্থ এ নয়, আমরা কিছুই পারছি না বা করছি না, এখানে অনুধাবন করার বিষয়, আমাদের চলচ্চিত্র ব্যাপারে শিক্ষার বেশ ঘাটতি আছে, যা আমাদের পূরণ করতে হবে এর ব্যাকরণটাকে ধারণ করার মাধ্যমে।
এই কথাগুলোর সবচেয়ে বড় পালটা প্রশ্ন হচ্ছে, অনেক বড় বড় নির্মাতারাই ব্যাকরণের ধার ধারেন না। তারা নিজের মনের ইচ্ছেমতন শট-দৃশ্য বাছাই করেন। তাহলে আমাদের কেন এত নিয়ম মানতে হবে?
এর উত্তর খুব সহজে একটা লাইনে বলা যায়, “Making Cinema is like playing a piano. First you must learn to play by the rules, then you must forget the rules and play from your heart”
হ্যাঁ, এভাবেই কালজয়ী সব কাব্য-গল্প-গ্রন্থ আর চলচ্চিত্র রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। আশা করা যায়, আমাদের দেশ থেকেও এরকম অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ নির্মাতা আসবে যারা নিজের পুরোটা দিয়ে চলচ্চিত্র বানাবে, যা বিশ্বব্যাপী হবে সমাদৃত।
মুদ্দা কথা, চলচ্চিত্র নির্মাণ অব্যাহত থাকুক, কিন্তু একই সাথে চলচ্চিত্র পড়া এবং শেখাটাও চলুক।
Comments
Post a Comment